নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ঘিরে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা বা কথিত ‘ক্রসফায়ার’ এবং সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর আলোচনার দাবি রাখে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রয়োগ, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। অপরাধী যত ভয়ংকরই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে আদালতের মুখোমুখি করাই পুলিশের দায়িত্ব। কে অপরাধী এবং তার কী শাস্তি হবে—সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার বিচার বিভাগের।
এ প্রেক্ষাপটে আইজিপির নামে প্রচারিত “সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারে প্রস্তুত”—এমন বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ফলে বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতি সমর্থন বা উৎসাহ দেওয়ার যেকোনো বক্তব্য আইনের শাসনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধ দমন করা, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও আইন ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ অপরিহার্য। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দেয়।
সাংবাদিক সমাজকে ঢালাও আক্রমণ কেন?
একইভাবে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে আইজিপির বক্তব্যও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা অপরাধের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তার তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো সাংবাদিক সমাজকে ‘মিথ্যাবাদী’, ‘অপসাংবাদিক’, ‘ঘুষখোর’ কিংবা ‘মাদকের সঙ্গে যুক্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংবাদমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সরকারের পাশাপাশি পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার জনসমক্ষে তুলে ধরা সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব। ফলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির ঢালাও মন্তব্য মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
কোনো সংবাদ অসত্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে তার প্রতিবাদ, সংশোধন দাবি এবং প্রচলিত আইনে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পুরো পেশাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সমস্যার সমাধান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যকার আস্থা ও পেশাগত সম্পর্ককে আরও দুর্বল করতে পারে।
জনগণ নিরাপত্তা চায়, বিচারহীনতা নয়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য তাই হতে হবে দায়িত্বশীল, সংযত ও সংবিধানসম্মত। এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে বলে প্রতীয়মান হতে পারে কিংবা কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে হেয় করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম—দুটিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। একটির দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, অন্যটির দায়িত্ব জনগণের জানার অধিকার রক্ষা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা। এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈরিতা নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও আইনের সীমার মধ্যে দায়িত্ব পালনই কাম্য।
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বক্তব্যের কোনো অংশ যদি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন কিংবা সাংবাদিক সমাজকে ঢালাওভাবে হেয় করে থাকে, তবে তা প্রত্যাহার ও সংশোধন করা উচিত।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শেষ কথা হওয়া উচিত আইন—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা নয়। অপরাধের বিচার হবে আদালতে, আর সংবাদমাধ্যম তার সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে স্বাধীনভাবে। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তির পরিচয়।
SobuzBanlgadesh
.jpg)