ঢাকা |

চাকা থামেনি জীবনের গাজীপুরে ২৭টি বিপন্ন পরিবারের মেঘে ঢাকা আকাশে ঈদের আগে এক চিলতে রোদ

চাকা থামেনি জীবনের গাজীপুরে ২৭টি বিপন্ন পরিবারের মেঘে ঢাকা আকাশে ঈদের আগে এক চিলতে রোদ ছবির ক্যাপশন :
header 3_728
চাকা থামেনি জীবনের
গাজীপুরে ২৭টি বিপন্ন পরিবারের মেঘে ঢাকা আকাশে ঈদের আগে এক চিলতে রোদ

এস এম আসাদুজ্জামান মিলন, গাজীপুরঃ

একটি সড়ক দুর্ঘটনা। ব্যস, সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ওলটপালট হয়ে যায় একটি সাজানো সংসার। কোনো কোনো চাকা শুধু পিচঢালা পথেই ঘোরে না, পিষে দিয়ে যায় একটি আস্ত পরিবারের স্বপ্ন, থামিয়ে দেয় বেঁচে থাকার স্বাভাবিক লড়াই। কেউ হারান ঘরের একমাত্র উপার্জক্ষম মানুষটিকে, কেউবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকেন।
গাজীপুর জেলার এমন ২৭টি অসহায় ও ভাগ্যবিড়ম্বিত পরিবারের জীবনে আজ তেমনি এক জমাট বাঁধা অন্ধকারের বুক চিরে আসন্ন ঈদের আগে জ্বলে উঠল আশার প্রদীপ। বৃহস্পতিবার (২১ মে) গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে’ আয়োজিত এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের মাঝে বিআরটিএ (BRTA) ট্রাস্টি বোর্ডের তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ১৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে এই অনুদানের চেক তুলে দেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া।
অনুষ্ঠানকক্ষের এক কোণে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক পিকআপ চালক মোঃ সেলিম। গত বছর এক মেঘলা দিনে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার একটি পা চিরতরে কেড়ে নেয় নিয়তি। যিনি নিজে এতকাল চাকা ঘুরিয়ে অন্যের গন্তব্যে মালামাল পৌঁছে দিতেন, আজ তার নিজের জীবনের চাকাই স্তব্ধ। ৪ সদস্যের পরিবারটি নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছিলেন তিনি।
আজ যখন জেলা প্রশাসকের হাত থেকে সহায়তার চেকটি নিচ্ছিলেন, সেলিমের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল তপ্ত অশ্রু। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন:
দুর্ঘটনা আমার পা কেড়ে নিয়ে পরিবারটাকে এক লহমায় রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছিল। ধারদেনা আর মানুষের করুণায় দিন কাটছিল। আজ এই সহায়তা পেয়ে মনে হচ্ছে আবার সন্তানদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারবো। আমি আবার বাঁচতে চাই।" সেলিমের ঠিক পাশেই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন খাদিজা আক্তার। গত বছর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তার ২৫ বছর বয়সী তরুণ সন্তানকে। যে ছিল পুরো পরিবারের একমাত্র আশার আলো, বেঁচে থাকার জ্বালানি। সন্তানের আকস্মিক বিদায়ের পর থেকে পরিবারটিতে উনুন জ্বললেও আনন্দের আলো জ্বলেনি।
সরকারের এই আর্থিক অনুদানের চেকটি বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে খাদিজা আক্তার বলেন: যে চলে গেছে তাকে তো আর কোনোদিন কোনো কিছুর বিনিময়ে ফিরে পাবো না বাবা। সন্তানের শূন্যতা কি আর টাকা দিয়ে পূরণ হয়? তবে এই কঠিন বিপদের দিনে সরকার যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ালো, তাতে অন্তত বাকি পরিবারটাকে নিয়ে মাথা গোঁজার একটা অবলম্বন খুঁজে পেলাম।"
চেক বিতরণকালে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া এক দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন: "আর্থিক সহায়তা কখনো জীবনের ক্ষতি বা পঙ্গুত্বের চিরস্থায়ী বেদনা মুছে দিতে পারে না। তবে এটি সংকটের এই কঠিন মুহূর্তে পরিবারগুলোকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শক্তি যোগাবে।"
তিনি আবেগ ধরে রেখে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনাদের অনুরোধ করব, এই টাকাটি কোনো অনুৎপাদনশীল কাজে নষ্ট করবেন না। এটিকে এমন কাজে লাগাবেন, যা থেকে অর্থ উপার্জনের একটি স্থায়ী পথ তৈরি হয়।
আবেগঘন এই অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালক, শ্রমিক ও পথচারী সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার এবং রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, একটি দুর্ঘটনা শুধু একজনের জীবন নেয় না, পুরো পরিবারকে জীবন্ত কবর দেয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা খাতুন, বিআরটিএ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বিপদের দিনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সরকারের এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গাজীপুরের সুশীল সমাজ। এই ২৭টি পরিবারের চোখে আজ যে স্বস্তির জল, তা কেবলই কিছু আর্থিক প্রাপ্তি নয়; বরং রাষ্ট্র যে তার বিপন্ন নাগরিকদের ভুলে যায় না—এ যেন তারই এক অনন্য এবং মানবিক উপাখ্যান।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : SobuzBanlgadesh
প্রতিবেদকের তথ্য
SobuzBanlgadesh

SobuzBanlgadesh

সর্বশেষ সংবাদ
চাকা থামেনি জীবনের গাজীপুরে ২৭টি বিপন্ন পরিবারের মেঘে ঢাকা আ

চাকা থামেনি জীবনের গাজীপুরে ২৭টি বিপন্ন পরিবারের মেঘে ঢাকা আ