ঢাকা | বঙ্গাব্দ

০১ নভেম্বর অধ্যাদেশের কারণে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা বন্ধের পথে

০১ নভেম্বর অধ্যাদেশের কারণে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা বন্ধের পথে ছবির ক্যাপশন : ফাইল ছবি
header 3_728
সরকারি ট্রাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশ‑২০২৫/২০২৬ কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশের ট্রাভেল খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন নিয়ম ও কঠোর শর্তের কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি এজেন্সি বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবেন, যা দেশীয় পর্যটন খাত এবং চাকরির বাজারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

অধ্যাদেশের কঠোর শর্তাবলীঃ               
১। এক ট্রাভেল এজেন্সি অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিকট হইতে টিকেট ক্রয়-বিক্রয় করতে পারিবে না।  
২। ট্রাভেল এজেন্সির একই  ঠিকানায় একই মালিকের  রিক্রুটিং এজেন্সি  ব্যবসা পরিচালনা করিতে পারিবে না।   
৩। অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ হইবে ১০ (দশ) লক্ষ টাকা। 
৪। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ হইবে ১ (এক) কোটি টাকা।
৫। ট্রাভেল এজেন্সি কর্তৃক প্রতি বৎসর আর্থিক বিবরণীসহ সার্বিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন সরকারের নিকট নির্ধারিত পদ্ধতিতে দাখিল করিতে হইবে। 
৬। টিকেটিং এর উদ্দেশ্যে কোনো এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস সিস্টেমরূপে ব্যবহৃত দেশি ও বিদেশি অ্যাপ্লিকেশন, সিস্টেম, পোর্টাল, প্ল্যাটফর্ম,
 ইত্যাদি ডিজিটাল টিকেট ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল অবৈধভাবে ব্যবহার করিলে বা ইহার লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড শেয়ার বা বিতরণ করিলে অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিকট হইতে টিকেট ক্রয়-বিক্রয় করিলে বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করিলে ট্রাভেল এজেন্সির ঠিকানা ব্যবহার করিয়া রিক্রুটিং এজেন্ট হিসাবে ব্যবসা পরিচালনা করিলে, 
সরকার কর্তৃক নির্ধারিত আর্থিক মাধ্যমে লেনদেন না করিলে, যে-কোনো উপায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করিয়া বা মিথ্যা তথ্য দ্বারা সৃষ্ট বুকিং এর মাধ্যমে টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করিলে, মিথ্যা তথ্য বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে মূল্য ছাড়, চটকদার প্রলোভন, 
ক্যাশব্যাক বা ইনসেনটিভ প্রদান সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রচার করিলে অথবা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অগ্রিম অর্থ আদায় করিলে, অভিবাসী কর্মী বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এর কার্ডধারীগণের ক্ষেত্রে উৎস দেশ ও গন্তব্য দেশ ব্যতীত তৃতীয় কোনো দেশ হইতে টিকেট ক্রয়-বিক্রয় করিলে এবং তাহাদের গ্রুপ বুকিং বা টিকেটিং এর ক্ষেত্রে টিকেট কনফার্মেশনের পর যাত্রীর তথ্য পরিবর্তন করিলে; 
অভিবাসী কর্মী বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এর কার্ডধারীগণের টিকেট ক্রয়-বিক্রয়কালে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে একত্রে অর্থ পরিশোধ করিলে; ট্রাভেল এজেন্সির চাকরি বা কার্যক্রমের সহিত এয়ারলাইন্স বা এর কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকিলে; 
অথবা টিকেটের গায়ে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, নিবন্ধন সনদ নম্বর ও মূল্য লেখা না থাকিলে। (আ) উপ-ধারা (২) এর পর নিম্নরূপ নূতন উপ-ধারা (৩) সংযোজিত হইবে, যথা কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন সনদ স্থগিত করা সমীচীন মর্মে প্রতীয়মান হইলে জনস্বার্থে, শুনানি গ্রহণ ব্যতীত, সরকার, সাময়িকভাবে উক্ত নিবন্ধন সনদ স্থগিত করিতে পারিবে। 
৭। কোনো ব্যক্তি এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিলে, উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ১ (এক) বৎসরের কারাদন্ড অথবা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
৮। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি। প্রতারণা, দুর্নীতি বা এতদসংক্রান্ত আবশ্যকীয় ক্ষেত্রে আকস্মিক দেশত্যাগ রোধকল্পে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহিত সমন্বয় সাধনপূর্বক ট্রাভেল এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করিবে।


সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১০,৩২৯টি ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধিত। এর মধ্যে বিভিন্ন কঠোর শর্ত আরোপের কারণে ১,৫৬১টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া, ৩,০৪৪টি এজেন্সি নবায়নের জন্য আবেদন করলেও এখনও মন্ত্রণালয় লাইসেন্স নবায়ন করে নি।
গণমাধ্যম ও খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধিত এজেন্সিগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়: 
মোট ১০,৩২৯টি এজেন্সির মধ্যে ১,৫৬১টি বাতিল, যা মোটের প্রায় ১৫%।
নবায়ন না হওয়া ৩,০৪৪টি এজেন্সি, যা মোটের ২৯%।
এই দুই ধরনের এজেন্সি মিলিয়ে প্রায় ৪৫% নিবন্ধিত এজেন্সি সরাসরি বা আংশিকভাবে কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক টিকেট ইস্যুর জন্য IATA অনুমোদিত এজেন্সি প্রায় ১,০০০টি, যার মধ্যে আনুমানিক ৫০% এর ব্যাংক গ্যারান্টি নেই। ফলে এদেরও কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক টিকেটিং সেবা প্রভাবিত হতে পারে।
  এ ধরণের বাধাগ্রস্ত অবস্থার কারণে গড়ে হিসেব করলে ৬০,০০০–৭০,০০০ মানুষ সরাসরি চাকরি হারাতে পারেন, যা  তাদের পরিবারের প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি সদস্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।  

শিল্প নেতারা মনে করছেন, এই কঠোর বিধান ছোট ও মাঝারি এজেন্সিগুলোর পক্ষে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব, ফলে ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হবে।
ট্রাভেল খাতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
নিবন্ধিত এজেন্সি কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত হলে ৬০,০০০–৭০,০০০ কর্মী সরাসরি চাকরি হারাতে পারেন।
এসব কর্মীর পরিবারগুলো খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খরচ সামলাতে হিমশিম খাবে।
বিদেশী ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে কোটি কোটি টাকার। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার রেভিনিউ কালেকশন হয়, এই আইন বাস্তবায়ন হলে রেভিনিউ কালেকশনে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

আসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (ATAB) জানিয়েছে, সরকারকে পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি এজেন্সিগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় দেশের পর্যটন খাত ও লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
এই অধ্যাদেশ সংস্কার অথবা স্থগিত না হইলে ট্রাভেল এজেন্সির অধিকাংশ সদস্যরা স্থায়ীভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং ব্যাবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : SobuzBanlgadesh
প্রতিবেদকের তথ্য
SobuzBanlgadesh

SobuzBanlgadesh

সর্বশেষ সংবাদ
ভোলায় নিখোঁজ ৩ মাসের শিশু লঞ্চ থেকে উদ্ধার

ভোলায় নিখোঁজ ৩ মাসের শিশু লঞ্চ থেকে উদ্ধার