এস এম আসাদুজ্জামান মিলন, গাজীপুরঃ
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পূবাইল থানার মেঘডুবি এলাকায় গত ২৬ এপ্রিল দুপুরে চা -পান দোকানদার শেফালী বেগম কুলসুম (৪৬) কে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে গাজীপুর পুলিশ ব্যূরো অফ ইনভেস্টিগেশন টিম। এ হত্যাকান্ডে জড়িত তিন আসামী রংপুর থেকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। আজ রবিবার ১০ মে গাজীপুর পিবিআই এসব তথ্য জানান। গ্রেফতারকৃতরা হলো রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানাধীন রাজবল্লভ এলাকার মোঃ কামরুজ্জামান (৩৫) এবং একই থানার একনাথ রামাকান্ত (গুচ্ছ গ্রাম) এলাকার মোঃ আমজাদ হোসেন (৩০) ও মোঃ আফজাল (৩৩)। গ্রেফতারকৃত আসামীরা এওয়ান পলিমার ফ্যাক্টরীতে লেবারের কাজ করতো।
পিবিআই জানায়, নিহত কুলসুমের দোকান থেকে নগদ ও বাকীতে মালামাল নিতো। সে কামরুজ্জামান, মনোয়ারের ও আমজাদের কাছে দোকান বাকির টাকা পেতো। উক্ত টাকা পাওনা নিয়ে কুলসুমের সাথে আসামীদের মনোমালিন্য হয়। দোকানবাকির টাকা নিয়ে কুলসুমের সাথে ঝগড়া হলে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। কুলসুম বাড়ীতে একা থাকায় তারা ডাকাতি পরিকল্পনা সাজায়। কুলসুম তার বাড়ীতে একা থাকার সুবিধা নিয়ে মনোয়ার তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটাতে চায়। এতে রাজি হয়ে কুলসুম মনোয়ারকে তার বান্ধবীকে নিয়ে তাদের বাসায় আসতে বলে। পরের দিন দুপুরে মনোয়ার ফল, স্পিড, বিস্কুট, চানাচুর ও ঘুমের ঔষুধ নিয়ে আসে এবং কামরুজ্জামানকে বাইরে রেখে ভিতরে গিয়ে কুলসুমকে দিয়ে ফল কাটিয়ে প্লেটে সাজায়। ঐ সময় আফজাল মনোয়ারকে ঘরে ঢুকতে দেখে তার ভাই আমজাদকে জানায়। এর ৩০ মিনিট পর কামরুজ্জামানকে মনোয়ার কল দিয়ে বলে কুলসুমকে স্পিডের ভিতর ঘুমের ঔষুধ খাওয়াইছে। এখন সে ঘুমে আছে তুমি ভেতরে আসো। এরপর আসামী কামরুজ্জামান এর সাথে আমজাদের দেখা হলে আমজাদ কামরুজ্জামানকে জানায় মনোয়ার কুলসুমের এর বাড়ীতে ঢুকছে, যা পাইবা আমাদের ভাগ দিতে হবে, আমরা কাউকে কিছু বলবো না। পরে কামরুজ্জামান গিয়ে দেখে টেবিলে ফল সাজানো, কুলসুম পাশের রুমে ঘুমে এপাশ ওপাশ করছে। পরে কামরুজ্জামান বাঁশের একটি লাঠি দিয়ে কুলসুমকে এর মাথায় বারি মারলে কুলসুম চিৎকার দেয়। পরে মনোয়ার পাশের রুম থেকে দা নিয়ে খাটের উপর উঠে কুলসুমের মুখসহ হাত ও পেটে এলোপাথারি কোপায়। এরপর আসামী কামরুজ্জামান ও মনোয়ার ঘরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজি করে নগদ ও স্বর্নালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় মনোয়ার রক্তমাখা দা বাথরুমে ধুয়ে পাশে রেখে দেয়। দোকানের পাশের গেইট দিয়ে বের হয়ে বাসায় চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আমজাদ এসে দেখে তারা টাকা গুনছে এবং স্বর্ণগুলো হাতে নিয়ে দেখছে। আসামী আমজাদ তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা নিয়ে যায় এবং বলে আমি এবং আমার ভাই আফজাল কাউকে কিছু বলবো না, পরে হিসেব করে ভাগ করবো। পরে আসামীরা তাদের নিজ এলাকায় গিয়ে কামরুজ্জামান ও মনোয়ার উক্ত স্বর্ণ নিয়ে রংপুর পুরান টার্মিনাল এর সুলতান মোড়ে স্বর্ণের দোকানে গিয়ে স্বর্ণগুলো দেখালে স্বর্ণকার তাদের জানায় এগুলো আসল স্বর্ন নয়। আমজাদ এবং আফজাল এগুলো বিশ্বাস করবে না বিধায় তারা এগুলো নিয়ে বাড়ী চলে আসে। পরবর্তীতে আমজাদ এবং আফজাল তাদের গ্রামে মনোয়ার এর বাড়ীতে গিয়ে স্বর্ণ বিক্রির টাকার ভাগ চাইলে আসামী কামরুজ্জামান বলে উক্ত গহনা নিয়ে সবাই মিলে স্বর্ণের দোকানে গিয়ে পরীক্ষা করবে।
গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানাধীন মেঘডুবি (কড়ইটেক) এলাকায় নিজ বাসায় থেকে চা পানের দোকান করে এবং তিনটি রুম ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন কুলসুম। স্বামী সন্তান অন্যত্র চলে যাওয়ায় সে এখানে একাই বসবাস করতেন। গত ২৬ এপ্রিল নিহত কুলসুমের মেয়ে তার মাকে মোবাইল ফোনে না পেয়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারকে বাসায় গিয়ে দেখতে বলেন। তখন সে জানায় যে, তার মায়ের বাসার বাহিরের গেইট বন্ধ। অনেক ডাকডাকির পরও সাড়া শব্দ না পেয়ে আত্মীয় স্বজন বাহিরের গেইট ভেঙ্গে বাড়ীর ভেতরে প্রবেশ করে বিছানায় কম্বলে মুড়িয়ে রাখা কুলসুমের মরদেহ পায়। খবর পেয়ে পুবাইল থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে।
পুলিশ জানায়, কুলসুমকে ধারালো অস্ত্র দ্বারা মাথায় ও মুখে এলোপাথারী কুপিয়ে হত্যা করে হয়েছে। পরদিন এ ব্যাপারে পুবাইল কুলসুমের মেয়ে বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলাদায়ের করেন। তখন থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই গাজীপুর জেলার একটি চৌকস দল ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য ছায়া তদন্ত অব্যাহত রেখে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় হত্যার সাথে জড়িত আসামীদের গ্রেফতার করে।গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে আসামী মোঃ কামরুজ্জামান ও মোঃ আমজাদ হোসেন হত্যাকান্ডের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ততার বিষয় স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদানে করে।
গ্রেফতারকৃত মোঃ কামরুজ্জামান ও মোঃ আমজাদ হোসেন শেফালী বেগম কুলসুমকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা, নগদ টাকা ও গহনা চুরি করার দায় স্বীকার করে নিজেদেরকে জড়িয়ে বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়াও ঘটনায় জড়িত অপর আসামী মোঃ আফজাল হোসেনকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ আদালত তাকে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জর করেন। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো দা ও একটি বাঁশের লাঠি উদ্ধার পূবর্ক জব্দ করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে।
SobuzBanlgadesh
.jpg)