ঢাকা |

বাংলাদেশের অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন রূপরেখা: বাজেট, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সমন্বিত কৌশল:

বাংলাদেশের অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন রূপরেখা: বাজেট, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সমন্বিত কৌশল: ছবির ক্যাপশন :
header 3_728

 *২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের আলোকে একটি নীতিগত বিশ্লেষণ:* 

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল তার মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধি কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সুশাসন, আধুনিক অবকাঠামো এবং নাগরিকের জীবনমান সমানভাবে বিকশিত হয়। অর্থাৎ অর্থ-সামাজিক উন্নয়ন একটি সমন্বিত ধারণা, যেখানে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, নগরায়ণ, পরিবহন, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়—কোনো দেশ কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। বরং তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। আজকের চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড কিংবা ফিনল্যান্ড—প্রত্যেক দেশের উন্নয়নের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। এই সময়ে দেশ কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সেবা এবং দারিদ্র্য হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে উন্নয়নের বহু মৌলিক সূচকে আমরা এখনও আমাদের সম্ভাবনার পুরোটা অর্জন করতে পারিনি।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা, দুর্বল সুশাসন, দুর্নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে যেসব দেশ একসময় বাংলাদেশের সমপর্যায়ে ছিল, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়েও ছিল, তাদের অনেকেই আজ শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল নতুনভাবে পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি। উন্নয়নের জন্য প্রতিবার নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরিবর্তে আমাদের উচিত বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ উন্নয়নের কোনো শর্টকাট নেই, কিন্তু সফল মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে সময়, অর্থ এবং নীতিগত ভুল—সবই কমানো সম্ভব।
চীনের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর দেশটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে চীন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্রই নয়, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায়ও অন্যতম শীর্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ভিয়েতনাম রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। থাইল্যান্ড পরিকল্পিত পর্যটন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ফিনল্যান্ড আবার প্রমাণ করেছে, একটি ছোট দেশও বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতাগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; বরং ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের এই বিশাল জনশক্তি। এই জনগোষ্ঠীকে যদি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কর্মদক্ষতার মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে বাংলাদেশ আগামী দুই দশকের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের একটি রোডম্যাপ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাজেটের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আধুনিক অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি—এই চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী।

 দ্বিতীয় পর্ব: বাজেট, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি:- 
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। একটি বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। তাই বাজেটের সাফল্য কেবল এর আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।
এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে শিক্ষা। তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে—এই অতিরিক্ত বরাদ্দ কি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে?
আমার দৃষ্টিতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং সেই বরাদ্দের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস আরও জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মুখস্থনির্ভর ও সনদকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রাধান্য রয়েছে। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এর ফলশ্রুতিতে একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তির সংকট রয়ে যাচ্ছে।
বিশেষভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দেশের অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বাস্তবতা যে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না।
তাই আমি মনে করি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করা নয়, বরং আধুনিকায়ন করা জরুরি। সাধারণ ডিগ্রির পাশাপাশি প্রতিটি কলেজে ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন, রোবোটিক্স, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা কর্মসূচি চালু করা উচিত। এতে একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রির পাশাপাশি কর্মদক্ষতাও অর্জন করতে পারবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে তার জনসংখ্যার মধ্যে। উন্নত বিশ্বে জনসংখ্যার বার্ধক্য বাড়ছে, অথচ বাংলাদেশ এখনও একটি তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দেশ। এই জনশক্তিকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। দক্ষ কর্মীরা শুধু দেশীয় শিল্পকে সমৃদ্ধ করবে না, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। কিন্তু আমাদের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এখনও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কাজ করেন। ফলে তারা তুলনামূলক কম আয় করেন। যদি সরকার প্রযুক্তিগত ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে আরও বিনিয়োগ করে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারে, তাহলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment—FDI) বৃদ্ধির জন্যও দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুধু কম শ্রমমূল্য নয়, দক্ষ শ্রমশক্তি, স্থিতিশীল নীতি, আইনের শাসন, অবকাঠামো এবং সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দেন। ফলে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ আসলে বিনিয়োগ আকর্ষণেরও একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলে এখন একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে আমরা উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধিকে সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচনা করেছি। এখন সময় এসেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতজন দক্ষ হয়ে কর্মসংস্থান পেল, কতজন উদ্যোক্তা হলো, কতজন আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উচ্চমূল্যের চাকরি পেল এবং কতজন দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে অবদান রাখতে পারল।
সুতরাং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প-শিক্ষা অংশীদারিত্ব এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করা হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি।

 তৃতীয় পর্ব: অবকাঠামো, সুশাসন ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা 
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো তার অবকাঠামো। আধুনিক সড়ক যোগাযোগ, দক্ষ গণপরিবহন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত বন্দর, রেলপথ, বিমানবন্দর এবং ডিজিটাল সংযোগ—এসব কেবল উন্নয়নের প্রতীক নয়; বরং এগুলোই উৎপাদনশীল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। উন্নত বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই অবকাঠামোকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে।
বাংলাদেশও গত এক দশকে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, বিশেষ করে নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এখনও আমাদের অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।
রাজধানী ঢাকা আজও বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ ও দূষিত মহানগরগুলোর একটি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সংকীর্ণ সড়ক, অপর্যাপ্ত ফুটপাত, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ দূষণ রাজধানীর অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে, জ্বালানির অপচয় হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিল্প ও সেবা খাতের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়ছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত শহরে নগর পরিকল্পনার শুরুতেই পর্যাপ্ত সড়ক, ফুটপাত, উন্মুক্ত স্থান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং গণপরিবহনের জন্য জমি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে নগর ব্যবস্থাপনা সহজ হয় এবং যানজট তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বাংলাদেশে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার সময় অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করা যায় না। ব্যক্তিগত জমির সীমাবদ্ধতা, সমন্বয়ের অভাব এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে অনেক এলাকায় সরু রাস্তা ভবিষ্যতের বড় সমস্যায় পরিণত হয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী আইনগত ক্ষমতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। নতুন আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে নির্ধারিত প্রশস্ততার সড়ক, ড্রেনেজ, ফুটপাত, উন্মুক্ত স্থান এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
পরিকল্পিত নগরায়ণ কেবল নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করে না; এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের আগে শুধু কর-সুবিধা বা শ্রম ব্যয় নয়; বরং শহরের অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশও মূল্যায়ন করেন। তাই বাংলাদেশ যদি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি করতে চায়, তাহলে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
উন্নয়নের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো সুশাসন এবং আইনের শাসন। কোনো রাষ্ট্রে যদি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নও টেকসই হয় না। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ নাগরিক—সবার জন্যই একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ অপরিহার্য। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কার সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। সমাজের দরিদ্র, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, অসহায় নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে—সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে আমি কয়েকটি নীতিগত বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাই—
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে।
তৃতীয়ত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় এবং দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে।
চতুর্থত, গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আধুনিক সড়ক যোগাযোগকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ষষ্ঠত, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর ক্ষমতায়ন এবং জবাবদিহির আওতায় এনে পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সপ্তমত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
অষ্টমত, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নবমত, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশকে উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় আনতে হবে।
দশমত, উন্নয়নের প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ব্যয়ের সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার এখনও উন্মুক্ত। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, উদ্যোক্তা শ্রেণি এবং প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা—সবকিছুই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি। এখন প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, বাস্তবভিত্তিক নীতি, সুশাসন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার ও ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকেরা যদি শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা এবং সুশাসনকে সমন্বিতভাবে অগ্রাধিকার দেন, তবে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সমগ্র এশিয়ার একটি প্রতিযোগিতামূলক ও সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হতে সক্ষম হবে। উন্নয়নের এই অভিযাত্রায় সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের আগামী দিনের জাতীয় অঙ্গীকার।

 চতুর্থ পর্ব (বিশেষ): উন্নয়নের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত আগামী দুই থেকে তিন দশকের উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, উন্নয়ন কখনো আকস্মিকভাবে আসে না; এটি আসে সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রনীতি, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে। তাই আমাদের উন্নয়ন কৌশলও হতে হবে ব্যক্তি বা সরকারের মেয়াদকেন্দ্রিক নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকেন্দ্রিক।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এখন একটি সমন্বিত "জাতীয় অর্থ-সামাজিক রূপান্তর কর্মপরিকল্পনা" গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হবে—মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, সুশাসন এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন।
১. মানবসম্পদকে সর্বোচ্চ জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে জনসংখ্যা সম্পদ নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ হয়ে উঠতে পারে। তাই আগামী দশ বছরে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ লাখ তরুণ-তরুণীকে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
২. শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার
শিক্ষাকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ, ইন্টার্নশিপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রম চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে।
৩. প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি গঠন
বাংলাদেশকে শুধু তৈরি পোশাকনির্ভর অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
৪. জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতিটি বিভাগীয় শহর এবং দ্রুত বর্ধনশীল পৌর এলাকায় ২০ থেকে ৩০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার আগে পর্যাপ্ত প্রশস্ত সড়ক, ড্রেনেজ, ফুটপাত, গণপরিবহন করিডর, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করতে হবে। নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদান করা জরুরি।
৫. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু কর-সুবিধা যথেষ্ট নয়। দ্রুত সেবা, নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির নিরাপত্তা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করতে হবে। "ওয়ান-স্টপ সার্ভিস" কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৬. রেমিট্যান্স অর্থনীতির গুণগত পরিবর্তন
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতিকে পুনর্গঠন করতে হবে। স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী, প্রকৌশলী, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রযুক্তিবিদ এবং আইটি পেশাজীবী তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। এতে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
৭. সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছাতে হবে। দরিদ্র, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
৮. সুশাসন ও জবাবদিহি
উন্নয়নের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল নজরদারি এবং স্বাধীন নিরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বাস্তবায়ন উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।
সরকারের জন্য ১৫টি নীতিগত সুপারিশ
১. শিক্ষা ব্যয়ের একটি বড় অংশ কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় স্থানান্তর করা।
২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক দক্ষতা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সংযুক্ত করা।
৩. প্রতিটি জেলায় আধুনিক টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা।
৪. গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পৃথক জাতীয় তহবিল গঠন।
৫. পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য নতুন নগর উন্নয়ন আইন প্রণয়ন।
৬. সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতা ও জবাবদিহির আওতায় আনা।
৭. সড়ক, গণপরিবহন ও লজিস্টিক অবকাঠামোকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
৮. বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানো।
৯. দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা।
১০. রেমিট্যান্স খাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
১১. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে কার্যকর বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
১২. ডিজিটাল সেবা ও ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ করা।
১৩. দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার দক্ষতা এবং আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করা।
১৪. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সবুজ অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
১৫. উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি সর্বদলীয় জাতীয় উন্নয়ন কমিশন গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।


উপসংহার
বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনাও। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা শ্রেণি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহসী, দূরদর্শী এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।
আমরা যদি উন্নয়নকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না করে একটি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে পারি, যদি শিক্ষা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, অবকাঠামো, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তবে আগামী দুই দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী এবং প্রতিযোগিতামূলক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।
উন্নয়নের ইতিহাস বলে—যে জাতি তার মানুষের ওপর বিনিয়োগ করে, সেই জাতিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশেরও সেই সামর্থ্য রয়েছে। এখন প্রয়োজন কেবল সঠিক সিদ্ধান্ত, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার অবিচল অঙ্গীকার।


মিজানুর রহমান
কলাম লেখক, এনজিও উন্নয়ন পরামর্শক এবং সমাজ ও টেকসই উন্নয়ন বিশ্লেষক

নিউজটি পোস্ট করেছেন : SobuzBanlgadesh
প্রতিবেদকের তথ্য
SobuzBanlgadesh

SobuzBanlgadesh

সর্বশেষ সংবাদ
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে আনসারের অভিযানে ৫০০ কেজি স্ক্র্যা

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে আনসারের অভিযানে ৫০০ কেজি স্ক্র্যা