রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স–এ আর্থিক অনিয়ম, ক্রয়–বাণিজ্যে অসঙ্গতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হলো পদায়ন প্রক্রিয়া। নানা অভিযোগে আলোচিত মহাব্যবস্থাপক (যানবাহন) মিজানুর রশীদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অর্থ ও মানবসম্পদ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুই শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—যা নিয়ে অভ্যন্তরে-বহির্ভাগে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সংবেদনশীল দুই বিভাগ এক কর্মকর্তার হাতে
সম্প্রতি জারি করা অফিস আদেশে দেখা যায়, মিজানুর রশীদকে অর্থ বিভাগ ও প্রশাসন-মানবসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ সরাসরি বাজেট, ব্যয়, ক্রয় ও আর্থিক অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত; অন্যদিকে মানবসম্পদ বিভাগ নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদারকি করে।
প্রশ্ন উঠেছে—যার বিরুদ্ধে অতীতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাকেই কীভাবে আবার আর্থিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হলো?
কী কী অভিযোগ?
বিমানের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে—
বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সফটওয়্যার ক্রয়
বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি কেনার অভিযোগ
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বাড়িভাড়া উত্তোলন
নিয়মবহির্ভূত বোনাস গ্রহণ
সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস
এসব অনিয়মের ফলে হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ তদন্তে উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সরকারি ক্রয়নীতিমালা, আর্থিক বিধি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই অভিযোগে ভারতের নাগরিক ভিনিত সুদের নামও উঠে এসেছে। তবে তিনি বর্তমানে দেশে না থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যোগাযোগের চেষ্টা, মিলেনি জবাব
অভিযোগ ও সাম্প্রতিক পদায়ন বিষয়ে জানতে মিজানুর রশীদের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অভিযোগের বিস্তারিত লিখে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, “বদলির চিঠি এখনো হাতে পাইনি। আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে তাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বোর্ড ও তদারকি কোথায়?
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।
একজন সাবেক বিমান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যেখানে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা, সেখানে বিতর্কিত কর্মকর্তাকে অর্থ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
লোকসানের বোঝা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
দীর্ঘদিন ধরেই লোকসান, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ার চাপে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই ছিল প্রত্যাশা।
কিন্তু অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তার হাতে অর্থ ও মানবসম্পদ বিভাগের মতো দুই গুরুত্বপূর্ণ শাখার দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অংশ, নাকি প্রভাবশালী চক্রের প্রভাব?
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ফলাফল প্রকাশ এবং দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে বিমানের আর্থিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা ও কার্যকর তদারকি—এমনটাই মত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের।
SobuzBanlgadesh
.jpg)